সাড়ে ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ: ১৬ পুলিশসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা

0
374

মানুষের জন্য ডেস্ক: মাগুরায় সরকারি তহবিল থেকে প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। যেখানে বাংলাদেশ পুলিশের বর্তমান ও সাবেক ১৬ সদস্য, সোনালী ব্যাংকের একজন এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের আটজনসহ মোট ২৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের সাধারণ ভবিষ্যত তহবিল (জিপিএফ), ল্যাম্প গ্যান্ট ও নিরাপত্তা জামানত (ডিপোজিট অ্যাগেইনস্ট ওয়ার্কস অ্যান্ড সাপ্লাই) একাউন্ট থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে মোট ১০ কোটি ৪৪ লাখ ১ হাজার ৩৪৮ টাকা আত্নসাৎ করা হয়েছে।

প্রায় আট মাসের অনুসন্ধান শেষে সোমবার (১৬ অগাস্ট) মাগুরার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে মামলা দায়ের করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের যশোর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মাহফুজ ইকবাল। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে পরস্পরের যোগসাজশে দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলার এজাহার ও দুদক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাগুরা পুলিশ সুপার কার্যালয় থেকে বাস্তবে কোনো বিল দেওয়া না হলেও জেলা হিসাব রক্ষণ ও ফিন্যান্স কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ৯ কোটি ৬৭ লাখ ৮৯ হাজার ৫৩৩ টাকার একাউন্ট পেয়ী চেক ইস্যু করা হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ জনের ৮১টি একাউন্ট ব্যবহার করে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

একইভাবে অন্য ছয়টি বিলের মাধ্যমে মাগুরা জেলা পুলিশের ছয়জন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যের জিপিএফের প্রাপ্য অর্থের অতিরিক্ত ৭৬ লাখ ১১ হাজার ৮১৫ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ইস্যুকৃত এসব চেকের বিপরীতে কোনো বিল প্রস্তুত করা হয়নি বা হিসাবরক্ষণ অফিসে দাখিল করা হয়নি। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আইবাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে এসব বিলের টোকেন এন্ট্রি, বিল অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বরাবর এ্যাডভাইস পাঠানো হয়েছে। যেখানে হিসাব রক্ষণ অফিসের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, ব্যাংক ও পুলিশের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে দুদক।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, মামলার আসামিদের মধ্যে মাগুরার সাবেক তিনজন জেলা হিসাব রক্ষণ ও ফিন্যান্স কর্মকর্তার নাম রয়েছে। তারা হচ্ছেন জি এম জিল্লুর রহমান, মো. সাইফুল ইসলাম ও সরকার রফিকুল ইসলাম। এছাড়াও মো. আজমল হোসেন ও মো. আবদুল লতিফ মিয়াসহ মাগুরা হিসাব রক্ষণ অফিসের পাঁচজন নিরীক্ষককে (অডিটর) মামলার আসামি করা হয়েছে।

দুদকের কর্মকর্তারা জানান, মামলায় ছয়জন অবসরপ্রাপ্ত সদস্যসহ পুলিশের ১৬ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন, কনস্টেবল গাজী মসিউর রহমান, মো. ফিরোজ হোসেন ও শিপন মৃধা। এর মধ্যে গাজী মসিউর রহমান পুলিশ সুপার কার্যালয় থেকে ক্যাশ সরকার (পুলিশ সদস্যদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য বিল–ভাউচার জমা দেওয়া ও উত্তোলনের কাজ করেন) হিসেবে জেলা হিসাবরক্ষণ ও ফিন্যান্স কর্মকর্তার কার্যালয়ে নিযুক্ত ছিলেন।

ফিরোজ হোসেন পুলিশ সুপার কার্যালয়ে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। আর কনস্টেবল শিপন মৃধা মসিউর রহমানের আত্মীয়।

অর্থ আত্মসাতের এই ঘটনায় সোনালী বাংকের একজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে দুদক। মো. ওয়াজেদ আলী নামে ওই ব্যক্তি বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের ঝিনাইদহ শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপ্যাল অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

এই ঘটনার সঙ্গে পুলিশ, হিসাব রক্ষণ অফিস ও ব্যাংকের কর্মকর্তা কর্মচারী ছাড়াও দুজন সাধারণ নাগরিকের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে দুদক। ওই দুজন হলেন, নড়াইলের লোহাগাড়া উপজেলার মাটিয়াডাঙ্গা গ্রামের আজমল মুন্সী ও মাগুরা সদর উপজেলার সাজিয়াড়া গ্রামের শাহাদাৎ হোসেনের মেয়ে রোকাইয়া ইয়াসমিন বিচিত্রা। এই দুজনের নামের হিসাবের মাধ্যমে ৫ কোটি টাকার বেশি উত্তোলন করা হয়েছে। তারা দুজনই অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের কারও আত্মীয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মাগুরা পুলিশ সুপার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ডিসেম্বরে অর্থ আত্নসাতের বিষয়টি নজরে আসার পর অভ্যন্তরীণ তদন্তে আটজন পুলিশ সদস্যের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এরমধ্যে পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ইতিমধ্যে তাদের বরখাস্ত করা হয়েছে। আর তিনজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে।

অভিযুক্তদের মধ্যে উপ-পরিদর্শক (এসআই), সহকারী উপ পরিদর্শক (এএসআই) ও কনস্টেবল পদের পুলিশ সদস্য রয়েছেন।

মাগুরা হিসাবরক্ষণ ও ফিন্যান্স কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, অর্থ আত্মসাতের এই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে দুজন অডিটরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here