জরায়ুমুখ ক্যানসারের চিকিৎসা

0
283

লাইফস্টাইল ডেস্ক-সাধারণত মানবদেহের সব কোষই সুবিন্যস্ত পদ্ধতিতে বিভাজিত কোষকলার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করে। অবিন্যস্ত ও অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজনে অস্বাভাবিক বৃদ্ধিপ্রাপ্ত কোষকলার বৃদ্ধি হলো টিউমার। এটি দুধরনের হয়ে থাকে- বিনাইন ও ম্যালিগন্যান্ট। ম্যালিগন্যান্ট টিউমারই হলো ক্যানসার। জরায়ুমুখের ম্যালিগন্যান্ট টিউমারটির নাম জরায়ুমুখ ক্যানসার।

ক্যানসারের কারণ : ১৮ বছর বয়সের নিচে বিয়ে বা যৌনমিলন, নানাজনের সঙ্গে যৌনমিলন, অপরিচ্ছন্ন জননেন্দ্রিয়, জননেন্দ্রিয়ের সংক্রামক রোগ, যেমন- হারপিস সিমপ্লেক্স ভাইরাস-টাইপ-২ ও হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস, ২০ বছর বয়সের নিচে গর্ভধারণ ও মা হওয়া, ধূমপান, নিম্ন আর্থসামাজিক অবস্থা ইত্যাদি।

রোগের লক্ষণ : অনিয়মিত রক্তস্রাব, ঋতু বন্ধের এক বছর পরও রক্তস্রাব, যৌনসঙ্গমের পর রক্তস্রাব, যোনিপথে অধিক পরিমাণ বাদামি বা রক্তমাখা স্রাবের আধিক্য ও দুর্গন্ধযুক্ত সাদা স্রাব। মনে রাখতে হবে, এসব লক্ষণের কোনোটাই ক্যানসার নিশ্চিতকরণের চিহ্ন নয়। তবে এসব গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন দেখে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়, রোগটা কোন ধরনের এবং কোন অবস্থায় রয়েছে।

চিকিৎসা : ক্যানসারের প্রাথমিক স্তরের শুরুতেই ধরা পড়লে এবং যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ সম্ভব হলে রোগী পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ক্যানসারের প্রাথমিক স্তরে জরায়ুমুখের অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজনের চিকিৎসা করা হয় ক্রায়োথেরাপির মাধ্যমে। এ সময় প্রচণ্ড ঠাণ্ডা প্রয়োগ করে আক্রান্ত কোষকলা ধ্বংস করে দেওয়া হয়। ইলেকট্রোকো ওয়াগুলেশন বা বৈদ্যুতিক প্রবাহের মাধ্যমেও প্রচণ্ড উত্তাপ সৃষ্টি করে আক্রান্ত কোষকলা ধ্বংস করা যায়। চিকিৎসার এ প্রক্রিয়ায় রোগীর সন্তান ধারণক্ষমতা অটুট থাকে।

সার্জারি : ক্যানসার যখন উৎপত্তিস্থলে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন সার্জারি চিকিৎসা বেছে নিয়ে থাকেন অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। এ চিকিৎসায় রোগীর সম্পূর্ণ জরায়ু অপসারণ করা হয়। এ পদ্ধতির নাম হিস্টারেক্টমি। কখনো কখনো যোনিপথের ওপরের অংশ এবং কাছের কোষকলা এবং লসিকাগ্রন্থি অপসারণ করা হয়, যাতে ক্যানসারে আক্রান্ত কোষ দূরবর্তী স্থানে ছড়িয়ে না পড়তে পারে।

রেডিয়েশন থেরাপি : এ চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো, বিকিরণের মাধ্যমে ক্যানসারে আক্রান্ত কোষের ধ্বংস বা ক্ষতি করা। অনেক সময় এ চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় টিউমারের প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে বা ব্যথা কমানোর জন্য। যখন ক্যানসার আক্রান্ত সব কোষ সার্জারির মাধ্যমে অপসারণ করা যায় না, তখন সার্জারির পর আবার রেডিয়েশন দেওয়া হয়।

চিকিৎসা-পরবর্তী করণীয় : সার্জারি বা রেডিয়েশন থেরাপির পর রোগীকে নির্দিষ্ট সময় পরপর পরীক্ষা করাতে হয়। যৌনমিলন থেকে কিছুদিন অবশ্যই বিরত থাকতে হয়। সব নিয়ম-কানুন যথাযথভাবে মেনে চললে চিকিৎসার দু-তিন মাসের মধ্যে রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

প্রতিরোধ : বিবাহিত জীবন বা যৌনজীবনে প্রবেশ করা প্রত্যেক নারীকে অবশ্যই প্রতি তিন বছরে একবার শারীরিক কিছু পরীক্ষা করাতে হয়। এ রোগের উপসর্গগুলো, যেমন- মাসিক অবস্থায় বা ঋতু বন্ধের পর অস্বাভাবিক রক্তস্রাব, স্রাব ইত্যাদি দেখলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এভাবে প্রত্যেক নারী যদি নিজের শরীর ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হন, তবে জরায়ুমুখের ক্যানসারের জন্য কোনো নারীকেই আর চরম মূল্য দিতে হবে না। ক্যানসারের সার্বিক প্রতিরোধ, সঠিক রোগ নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করে কালব্যাধি ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

লেখক : রেডিয়েশন ও মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট

অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, অনকোলজি বিভাগ

এনাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, সাভার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here